বাজার থেকে ট্রাইকো কম্পোস্ট কেনার পাশাপাশি একটি মজার সত্যি হলো — এটি ঘরেই খুব সহজে বানানো যায়। আপনার যদি ইতিমধ্যে ঘরে কম্পোস্ট বা গোবর সার থাকে, তবে শুধু সামান্য ট্রাইকোডার্মা মিশিয়েই তৈরি করে ফেলতে পারেন নিজের ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি — যা পুষ্টি ও রোগ-প্রতিরোধ দুটোই দেয়। এতে খরচ কমে, আর নিজের বানানো সার নিয়ে নিশ্চিত থাকা যায়। এই লেখায় ধাপে ধাপে দেখব ঘরে ট্রাইকো কম্পোস্ট বানানোর নিয়ম, কী কী লাগবে, কতদিন লাগবে এবং কোন ভুলগুলো এড়াবেন।
ট্রাইকো কম্পোস্ট কী ও কেন নিজে বানাবেন
ট্রাইকো কম্পোস্ট হলো সাধারণ কম্পোস্টের সঙ্গে উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে তৈরি জৈব সার। ঘরে বানানোর সুবিধা অনেক — খরচ কম, রান্নাঘর ও বাগানের বর্জ্য কাজে লাগে, আর সার কী দিয়ে তৈরি তা নিয়ে সন্দেহ থাকে না। ট্রাইকোডার্মা কম্পোস্টের ভেতরে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে, তাই অল্প ট্রাইকোডার্মা দিয়েই অনেকটা ট্রাইকো কম্পোস্ট বানানো যায়।
যা যা লাগবে
- প্রস্তুত কম্পোস্ট বা গোবর সার: ভালোভাবে পচা, ঝুরঝুরে (ঘরে বানানো বা কেনা)।
- ট্রাইকোডার্মা গুঁড়া: প্রতি ২০–২৫ কেজি কম্পোস্টে প্রায় ১০০ গ্রাম।
- পানি: মিশ্রণ হালকা আর্দ্র রাখতে।
- ছায়াযুক্ত জায়গা: রোদ থেকে দূরে, যেখানে মিশ্রণ রাখা যাবে।
ঘরে কম্পোস্ট বানানো না থাকলে আগে দেখে নিন ঘরে কম্পোস্ট তৈরির গাইড ও ঘরে ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি।

ধাপে ধাপে বানানোর পদ্ধতি
- প্রস্তুত কম্পোস্ট বা গোবর সার একটি ছায়াযুক্ত জায়গায় ছড়িয়ে দিন।
- কম্পোস্ট হালকা আর্দ্র করুন — মুঠোয় চেপে ধরলে ভিজে থাকবে কিন্তু পানি ঝরবে না, এমন।
- প্রতি ২০–২৫ কেজি কম্পোস্টে প্রায় ১০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা ছিটিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিন।
- মিশ্রণ স্তূপ করে হালকা চটের বস্তা বা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন।
- ৭–১৫ দিন ছায়ায় রেখে দিন; মাঝে ২–৩ বার উল্টে-পাল্টে দিন ও দরকারে হালকা পানি ছিটান।
মিশ্রণ কখনো কড়া রোদে রাখবেন না — জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা তাপে মরে যায়। সবসময় ঠান্ডা, ছায়াযুক্ত জায়গা বেছে নিন।
ট্রাইকোডার্মা মেশানোর সঠিক নিয়ম
ট্রাইকোডার্মা যেহেতু জীবন্ত ছত্রাক, তাই মেশানোর সময় কয়েকটি বিষয় জরুরি। কম্পোস্ট অবশ্যই আর্দ্র থাকতে হবে — শুকনো কম্পোস্টে স্পোর জাগে না। মিশ্রণে কোনো রাসায়নিক সার, ছত্রাকনাশক বা জীবাণুনাশক দেবেন না। আর্দ্রতা ও ছায়া পেলে ট্রাইকোডার্মা কয়েক দিনেই পুরো স্তূপে ছড়িয়ে পড়ে — কখনো কখনো মিশ্রণের ওপর হালকা সবুজাভ আস্তরণ দেখা যায়, যা ট্রাইকোডার্মা বাড়ছে তারই লক্ষণ।
প্রস্তুত হয়েছে কীভাবে বুঝবেন
৭–১৫ দিন পর মিশ্রণে মাটির মতো সোঁদা গন্ধ আসবে ও এটি ঝুরঝুরে থাকবে — তখন ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারের উপযুক্ত। কোথাও হালকা সবুজ ছোপ দেখলে ঘাবড়াবেন না, ওটাই উপকারী ট্রাইকোডার্মা। দুর্গন্ধ বা কাদা-ভেজা মনে হলে আরও কিছুদিন শুকিয়ে ও উল্টে নিন। প্রস্তুত ট্রাইকো কম্পোস্ট বেশিদিন জমিয়ে না রেখে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবহার করাই ভালো, কারণ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা তাজা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
কীভাবে ব্যবহার করবেন
| স্থান | মাত্রা |
|---|---|
| ৩০ সেমি টব | ২০০–৩০০ গ্রাম, প্রতি ৩০ দিনে |
| নতুন মাটি তৈরিতে | মোট মাটির ১০–২০% |
| ছাদের বেড | প্রতি বর্গমিটারে ২–৩ কেজি |
মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিন, তারপর হালকা পানি দিন। ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের বিস্তারিত নিয়ম দেখুন ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার গাইডে।
একবারে কতটা বানাবেন
প্রথমবার অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করাই ভালো — কারণ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা তাজা অবস্থায় সবচেয়ে কার্যকর, বেশি বানিয়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে গুণ কমে যায়। একটি ছোট ছাদ বা বারান্দা বাগানের জন্য ৫–১০ কেজি কম্পোস্টে ৪০–৫০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে শুরু করতে পারেন; প্রয়োজন বুঝে পরে আবার বানিয়ে নিন। এভাবে অপচয় হয় না, আর প্রতিবার তাজা ও কার্যকর ট্রাইকো কম্পোস্ট পাওয়া যায়।
সাধারণ ভুল যা এড়াবেন
- কড়া রোদে রাখা: ট্রাইকোডার্মা মরে যায় — সবসময় ছায়ায় রাখুন।
- শুকনো কম্পোস্টে মেশানো: আর্দ্রতা ছাড়া ছত্রাক ছড়ায় না।
- রাসায়নিক মেশানো: ছত্রাকনাশক বা রাসায়নিক সার দিলে ট্রাইকোডার্মা ধ্বংস হয়।
- কাঁচা কম্পোস্ট ব্যবহার: ভালোভাবে না পচা কম্পোস্ট গাছের ক্ষতি করে — আগে পুরো পচতে দিন।
কেনা নাকি বানানো
ঘরে বানালে খরচ কম ও বর্জ্য কাজে লাগে, তবে সময় ও একটু যত্ন লাগে এবং মান একেকবার একেক রকম হতে পারে। তৈরি ট্রাইকো কম্পোস্ট কিনলে সময় বাঁচে ও মান নিশ্চিত থাকে — বিশেষত যাঁদের ঘরে কম্পোস্ট বানানোর জায়গা বা সময় নেই। অনেকে দুটোই করেন — অল্প কিনে শুরু করেন, পরে ঘরের কম্পোস্টে ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে নিজেই বানিয়ে নেন।
উপসংহার
ঘরে ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি মোটেও কঠিন নয় — প্রস্তুত কম্পোস্টে সামান্য ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে ছায়ায় কয়েক দিন রাখলেই হয়ে যায় পুষ্টি ও রোগ-প্রতিরোধে ভরা জৈব সার। এতে খরচ বাঁচে, বর্জ্য কাজে লাগে আর বাগান থাকে রোগমুক্ত। নিজের হাতে জৈব সার বানিয়ে সুস্থ বাগান গড়তে আরও গাইড দেখুন GrowDeshi-তে।
সাধারণ প্রশ্ন
ঘরে ট্রাইকো কম্পোস্ট কীভাবে বানাব?
প্রস্তুত কম্পোস্ট বা গোবর সার হালকা আর্দ্র করে প্রতি ২০–২৫ কেজিতে প্রায় ১০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে ছায়ায় ৭–১৫ দিন রেখে দিন, মাঝে উল্টে দিন — তৈরি হয়ে যাবে ট্রাইকো কম্পোস্ট।
কতদিনে ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি হয়?
সাধারণত ৭–১৫ দিন। মিশ্রণে মাটির মতো সোঁদা গন্ধ এলে ও ঝুরঝুরে হলে বুঝবেন ব্যবহারের উপযুক্ত।
ট্রাইকো কম্পোস্ট বানাতে কি রোদ লাগে?
না, বরং উল্টো। ট্রাইকোডার্মা জীবন্ত ছত্রাক — কড়া রোদে মরে যায়। মিশ্রণ সবসময় ছায়াযুক্ত, ঠান্ডা জায়গায় রাখুন।
মিশ্রণে সবুজ ছোপ দেখলে কি নষ্ট হয়ে গেছে?
না। হালকা সবুজাভ আস্তরণ আসলে ট্রাইকোডার্মা বাড়ছে তারই লক্ষণ — এটি ভালো। তবে দুর্গন্ধ বা পচা কাদার মতো হলে আরও শুকিয়ে উল্টে নিন।
ঘরে বানানো নাকি কেনা ট্রাইকো কম্পোস্ট ভালো?
ঘরে বানালে খরচ কম ও বর্জ্য কাজে লাগে; কেনা সার সময় বাঁচায় ও মান নিশ্চিত করে। ঘরে জায়গা-সময় থাকলে বানানো, না থাকলে কেনা — দুটোই ভালো।
আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য দেখুন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS)।