বাগানের দোকানে গিয়ে দেখবেন সারির পর সারি জৈব সার — নিম খৈল, সরিষার খৈল, হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি, ভার্মিকম্পোস্ট, গোবর সার। প্রতিটির প্যাকেটেই লেখা “গাছের জন্য উপকারী”। কিন্তু কোনটায় ঠিক কী আছে, আর আপনার গাছের এখন কোনটা দরকার — সেটা কোথাও লেখা থাকে না। রাসায়নিক সারের প্যাকেটে অন্তত ২০:২০:২০ লেখা থাকে, জৈব সারে সেটুকুও নেই। ফলে বেশিরভাগ বাগানি অনুমানে সার দেন, আর পাতা বেশি অথচ ফল কম — এমন সমস্যায় পড়েন। জৈব সারে এনপিকে কতটুকু থাকে, কোন সার কোন কাজের জন্য — এই লেখায় তার একটি পূর্ণ চার্ট দেওয়া হলো, সঙ্গে কোন অবস্থায় কোনটা বেছে নেবেন তার সহজ নির্দেশনা।
এনপিকে আসলে কী — তিন অক্ষরে তিন কাজ
গাছের প্রধান তিনটি খাদ্য উপাদানকে সংক্ষেপে বলা হয় এনপিকে:
- N — নাইট্রোজেন: পাতা ও কাণ্ড বাড়ায়, গাছ সবুজ রাখে। শাক জাতীয় গাছের প্রধান চাহিদা।
- P — ফসফরাস: শিকড় শক্ত করে, ফুল ও ফল ধরায়। চারা লাগানোর সময় ও ফুল আসার আগে দরকার।
- K — পটাশিয়াম: ফলের আকার, স্বাদ ও মান বাড়ায়; গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
এনপিকে নিয়ে বিস্তারিত সহজ ব্যাখ্যা আছে এনপিকে সার কি — টবের বাগানির ভাষায় লেখায়।

জৈব সারে এনপিকে — পূর্ণ চার্ট
নিচের সংখ্যাগুলো আনুমানিক গড় মান। জৈব সারের পুষ্টিমাত্রা উৎস, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণভেদে বেশ খানিকটা বদলায় — একই নামের দুই ব্যাচের মানও এক হয় না। তাই এগুলোকে নিখুঁত হিসাব নয়, তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করুন।
| জৈব সার | N | P | K | প্রধান কাজ |
|---|---|---|---|---|
| শিং কুচি | খুব বেশি | কম | কম | দীর্ঘমেয়াদি নাইট্রোজেন |
| সরিষার খৈল | বেশি | কম | কম | দ্রুত সবুজ পাতা |
| নিম খৈল | বেশি | কম | মাঝারি | সার + পোকা দমন |
| হাড়ের গুঁড়া | মাঝারি | খুব বেশি | নেই | ফুল ও ফল |
| ভার্মিকম্পোস্ট | মাঝারি | মাঝারি | মাঝারি | সুষম ভিত্তি সার |
| গোবর সার | কম | কম | কম | মাটির গঠন ও জৈব পদার্থ |
| কাঠের ছাই | নেই | কম | বেশি | পটাশিয়াম ও pH |
| কলার খোসা | কম | কম | বেশি | ফলের মান |
| ডিমের খোসা | নেই | নেই | নেই | ক্যালসিয়াম |
| ট্রাইকো কম্পোস্ট | মাঝারি | মাঝারি | মাঝারি | সার + রোগ দমন |
চার্টটা এক লাইনে মনে রাখার উপায় — খৈল মানে পাতা, হাড় মানে ফুল-ফল, ছাই মানে ফলের মান, আর ভার্মিকম্পোস্ট মানে সবকিছু একটু একটু।
নাইট্রোজেনের জৈব উৎস
গাছ ফ্যাকাশে, পাতা ছোট, বাড়ছে না — এই অবস্থায় নাইট্রোজেন লাগে। সবচেয়ে ভালো উৎস তিনটি:
- সরিষার খৈল: দ্রুততম কাজ করে, তবে অবশ্যই ৫–৭ দিন পানিতে পচিয়ে তরল করে দিতে হবে। কাঁচা খৈল সরাসরি দিলে গাঁজনের তাপে শিকড় পোড়ে।
- শিং কুচি: সবচেয়ে ঘন নাইট্রোজেন উৎস, কিন্তু খুব ধীরে ছাড়ে — এক প্রয়োগে কয়েক মাস চলে।
- নিম খৈল: নাইট্রোজেনের সঙ্গে মাটির পোকা ও কৃমিও দমন করে — দুই কাজ একসাথে।
বিস্তারিত নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ জৈব সার লেখায়।
ফসফরাসের জৈব উৎস
গাছ ভালো বাড়ছে কিন্তু ফুল আসছে না, বা ফুল এসেই ঝরে যাচ্ছে — তখন ফসফরাস দরকার। প্রধান উৎস হাড়ের গুঁড়া, যা জৈব জগতের সবচেয়ে ঘন ফসফরাস উৎস।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা — হাড়ের গুঁড়া খুব ধীরে কাজ করে, ছাড়তে ২–৩ মাস লাগে। তাই এটি ফুল আসার পরে নয়, চারা লাগানোর সময় মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ফুল আসার পর দিলে সেই মৌসুমে কাজে লাগবে না। ব্যবহারবিধি আছে হাড়ের গুঁড়া ব্যবহারের নিয়মে।
পটাশিয়ামের জৈব উৎস
ফল ছোট হচ্ছে, স্বাদ কম, গাছ সহজে রোগে ধরছে — পটাশিয়ামের ঘাটতির লক্ষণ। জৈব উৎস:
- কাঠের ছাই: সবচেয়ে সহজলভ্য ও শক্তিশালী পটাশ উৎস, প্রায় বিনামূল্যে। তবে ক্ষারীয় — মিশ্রণের ৫%-এর বেশি নয়।
- কলার খোসা: শুকিয়ে গুঁড়ো করে, বা পানিতে ভিজিয়ে তরল সার হিসেবে।
- ভার্মিকম্পোস্ট: পরিমাণে কম, কিন্তু নিয়মিত সরবরাহ দেয়।
কোন গাছে কোন সার — সিদ্ধান্তের চার্ট
| গাছ | মূল চাহিদা | যা দেবেন |
|---|---|---|
| পালং, লালশাক, ধনেপাতা | N | সরিষার খৈল তরল, ভার্মিকম্পোস্ট |
| টমেটো, বেগুন | P ও K | হাড়ের গুঁড়া (শুরুতে) + ছাই (ফল ধরার সময়) |
| মরিচ | সুষম | ভার্মিকম্পোস্ট + অল্প হাড়ের গুঁড়া |
| লাউ, কুমড়া, করলা | N তারপর K | শুরুতে খৈল, ফুল এলে ছাই |
| মুলা, গাজর | P ও K | হাড়ের গুঁড়া + ছাই (N কম রাখুন) |
| নতুন চারা | P | হাড়ের গুঁড়া মাটিতে মিশিয়ে |
মুলা-গাজরে বেশি নাইট্রোজেন দিলে পাতা বড় হয় কিন্তু শিকড় ছোট থাকে — যেটা খাওয়ার অংশ সেটাই বাড়ে না। মূল জাতীয় সবজিতে খৈল কম, হাড়ের গুঁড়া ও ছাই বেশি।
মৌসুম ধরে সার দেওয়ার ক্রম
- মাটি তৈরির সময়: ভার্মিকম্পোস্ট (ভিত্তি) + হাড়ের গুঁড়া (ধীরে ছাড়া ফসফরাস) + নিম খৈল (পোকা দমন)।
- চারা লাগানোর ২ সপ্তাহ পর: পাতলা সরিষার খৈলের তরল সার — বৃদ্ধির ধাক্কা।
- ফুল আসার আগে: নাইট্রোজেন কমান, ছাই বা কলার খোসার সার দিন।
- ফল ধরার সময়: ১৫ দিন পর পর ভার্মিকম্পোস্ট + অল্প ছাই।
- ফসল শেষে: মাটিতে গোবর সার মিশিয়ে পরের মৌসুমের প্রস্তুতি।
প্রতিটির নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে জৈব সারের ডোজ চার্টে।
জৈব সার কেন রাসায়নিকের মতো “দ্রুত” নয়
রাসায়নিক সার পানিতে গলে সরাসরি শিকড়ে পৌঁছায়, তাই ২–৩ দিনেই ফল দেখা যায়। জৈব সার কাজ করে ভিন্নভাবে — মাটির অণুজীব একে ধীরে ভেঙে গাছের গ্রহণযোগ্য রূপে আনে। এতে সময় লাগে ২ থেকে ৮ সপ্তাহ।
এর অসুবিধা হলো ধৈর্য ধরতে হয়। সুবিধা তিনটি — মাত্রা একটু বেশি হলেও গাছ পোড়ে না, পুষ্টি বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় না, আর প্রতি মৌসুমে মাটি আরও উর্বর হয়। তুলনা বিস্তারিত আছে জৈব বনাম রাসায়নিক সার লেখায়।
এনপিকের বাইরে — ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য উপাদান
এনপিকে নিয়ে এত কথা হয় যে বাকি উপাদানগুলো চাপা পড়ে যায়। অথচ বাড়ির টবে কিছু সমস্যা এনপিকে দিয়ে কখনোই সমাধান হয় না:
| উপাদান | কাজ | ঘাটতির লক্ষণ | জৈব উৎস |
|---|---|---|---|
| ক্যালসিয়াম | কোষপ্রাচীর ও ফলের গঠন | টমেটোর নিচে কালো দাগ | ডিমের খোসা, ঝিনুক গুঁড়া |
| ম্যাগনেসিয়াম | ক্লোরোফিল তৈরি | পাতার শিরা সবুজ, মাঝখানে হলুদ | ইপসম সল্ট, কম্পোস্ট |
| সালফার | প্রোটিন গঠন | নতুন পাতা ফ্যাকাশে | খৈল জাতীয় সার |
| আয়রন | ক্লোরোফিল | নতুন পাতা হলুদ, শিরা সবুজ | ভার্মিকম্পোস্ট |
টমেটো বা ক্যাপসিকামের নিচের দিকে কালো পচা দাগ দেখলে সেটি রোগ নয়, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি। এতে ছত্রাকনাশক দিয়ে কোনো লাভ নেই — ডিমের খোসার গুঁড়া বা ঝিনুক গুঁড়া লাগবে।
সার কেনার আগে যে চারটি জিনিস দেখবেন
- গাছের বর্তমান অবস্থা: পাতা সমস্যা না ফুল-ফল সমস্যা? আগে সেটা ঠিক করুন, তারপর সার বাছুন।
- কত দ্রুত দরকার: খৈলের তরল সার ৭–১০ দিনে কাজ করে, হাড়ের গুঁড়া ২–৩ মাস নেয়। জরুরি অবস্থায় ধীরগতির সার কিনে লাভ নেই।
- মৌসুমের কোন পর্যায়ে আছেন: শুরুতে হলে ধীরে-ছাড়া সার ভালো; মাঝপথে হলে দ্রুত কাজ করা সার।
- টবের সংখ্যা: পাঁচ-ছয়টি টবের জন্য বড় বস্তা কিনে লাভ নেই — জৈব সার দীর্ঘদিন রাখলে গুণ কমে।
সবচেয়ে সাধারণ চারটি ভুল
- একই সার সারা বছর: গাছের চাহিদা মৌসুমভেদে বদলায়। শুরুতে নাইট্রোজেন, ফুলের সময় ফসফরাস-পটাশিয়াম।
- ফুল আসার পর হাড়ের গুঁড়া দেওয়া: এটি ছাড়তে ২–৩ মাস লাগে, তাই ওই মৌসুমে আর কাজে লাগবে না। দিতে হয় চারা লাগানোর সময়।
- কাঁচা খৈল সরাসরি টবে: গাঁজনের তাপে শিকড় পোড়ে ও দুর্গন্ধে পোকা আসে। সবসময় পচিয়ে, পাতলা করে।
- ফল না ধরলেই আরও সার: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা সারের অভাব নয়, বরং নাইট্রোজেনের আধিক্য বা পরাগায়নের ঘাটতি।
একসঙ্গে কেনার সহজ উপায়
নতুন শুরু করলে প্রতিটি সার আলাদা কেনার দরকার নেই। বেশিরভাগ বাড়ির টব-বাগানে চারটি সার দিয়েই পুরো মৌসুম চলে — ভার্মিকম্পোস্ট (ভিত্তি), সরিষার খৈল (N), হাড়ের গুঁড়া (P) ও নিম খৈল (পোকা)। এই চারটি একসঙ্গে আছে জৈব সার প্যাকেজে। পটাশিয়ামের জন্য রান্নাঘরের ছাই ও কলার খোসাই যথেষ্ট।
উপসংহার
জৈব সারে এনপিকে লেখা থাকে না বলে অনুমানে সার দেওয়ার দরকার নেই — প্রতিটি জৈব সারের একটা স্পষ্ট চরিত্র আছে। খৈল জাতীয় সার নাইট্রোজেন দেয় অর্থাৎ পাতা বাড়ায়; হাড়ের গুঁড়া ফসফরাস দেয় অর্থাৎ ফুল-ফল ধরায়; ছাই ও কলার খোসা পটাশিয়াম দেয় অর্থাৎ ফলের মান বাড়ায়; আর ভার্মিকম্পোস্ট তিনটিই অল্প অল্প দিয়ে ভিত্তি তৈরি করে। গাছের অবস্থা দেখে এই চার্ট মিলিয়ে নিলে কোনটা কখন দিতে হবে তা আর অনুমান করতে হবে না। আরও বাগান-পরামর্শের জন্য দেখুন GrowDeshi।
আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য দেখুন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS)।
সাধারণ প্রশ্ন
জৈব সারের প্যাকেটে এনপিকে লেখা থাকে না কেন?
জৈব সারের পুষ্টিমাত্রা উৎস ও প্রক্রিয়াকরণভেদে বদলায়, তাই রাসায়নিক সারের মতো নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া কঠিন। একই নামের দুই ব্যাচেও মান এক হয় না। তাই আনুমানিক মান জেনে তুলনা করে নেওয়াই বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন কোন জৈব সারে?
শিং কুচিতে সবচেয়ে ঘন নাইট্রোজেন থাকে, তবে এটি খুব ধীরে ছাড়ে। দ্রুত ফল চাইলে সরিষার খৈল পচিয়ে তরল সার হিসেবে দিন — কয়েক দিনেই পাতায় সবুজ ভাব ফেরে।
ফুল আনতে কোন জৈব সার দেব?
হাড়ের গুঁড়া — এটি ফসফরাসের সবচেয়ে ঘন জৈব উৎস। তবে এটি ২–৩ মাস সময় নেয়, তাই ফুল আসার পর নয়, চারা লাগানোর সময়ই মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
পটাশিয়ামের জন্য কী দেব?
কাঠের ছাই সবচেয়ে সহজলভ্য ও শক্তিশালী উৎস, প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কলার খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করেও দেওয়া যায়। ছাই ক্ষারীয়, তাই মিশ্রণের ৫%-এর বেশি দেবেন না।
সব সার কি একসঙ্গে দেওয়া যায়?
মাটি তৈরির সময় ভার্মিকম্পোস্ট, হাড়ের গুঁড়া ও নিম খৈল একসঙ্গে মেশানো যায় — এগুলো ধীরে ছাড়ে। কিন্তু সরিষার খৈলের তরল সার আলাদাভাবে, গাছ বড় হওয়ার পর দিতে হয়। আর ছাই ও তাজা খৈল একসঙ্গে না দেওয়াই ভালো।